কাজী ওয়াজেদ আলী:
এত প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে যে, পুলিশ পিকআপের উইনশীল্ডে হুইপারের ঘনঘন অটো ক্লিনিয়ের পরও দশ হাত দূরত্বের কোনকিছু ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। রাত্র আনুমানিক সাড়ে তিনটায় তখন সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে টহল ডিউটি করতে করতে রামপুরা টিভি সেন্টারের বিপরীত পাশে মোল্লা টাওয়ারের সামনে পৌঁছি। পুলিশ পিকআপের হেডলাইটের কড়া আলোর বিচ্ছুরণ ভেদ করে সামান্য দূরত্বে তাকাতেই হঠাৎ আমার দৃষ্টি আটকে গেল।
এত গভীর রাতে একজন নারী এবং দুজন পুরুষকে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে পানিতে চাকা ডুবে স্টার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি সিএনজির পিছনে ঠেলতে দেখলাম! বেশ কিছু দূর ঠেলার পর ভ্যাটর ভ্যাটর করেও স্টার্ট হলো না সিএনজিটা। একজন হাত উঁচু করে চলমান একটি ট্রাক থামাতে ব্যর্থ হলো। বৃষ্টিতে ভিজে ওনাদের গাড়ি পাওয়ার তৎপরতা আর সামগ্রিক আচরণ দেখে সবাইকে খুব উদ্বিগ্ন মনে হলো। আমার পাশে বসা চালককে হর্ণ দিতে বলে সামনের ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম।
কাক ভেজা অবস্থায় ছবির ভদ্রলোক পিকাপের জানালার ধারে আমার কাছে কাঁদতে কাঁদতে বলল, স্যার সিএনজি স্টার্ট হচ্ছে না। আর বাকি যা বললো তার সারমর্ম হলো, সাথে থাকা ওনার ছেলেকে মধ্যপ্রাচ্যের কোন এক দেশে পাঠানোর জন্য টাকা দিয়েছে। আর আধা ঘন্টার মধ্যে এয়ারপোর্টে না পৌঁছাতে পারলে ওনার ফ্লাইট মিস হয়ে যাবে, উনি সারা জীবনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অথচ এত রাতে রাস্তায় কোন গণপরিবহনও নেই। কিন্তু উনি আমাকে এছাড়া অন্য কিছু বলার সাহস পেলেন না।
আমার ডিউটির আওতা ছিল রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত। রাতে এলাকায় যাতে কোন চুরি ছিনতাই না ঘটে সেটাই দেখা আমার মূল দায়িত্ব। ভদ্রলোকের বিপদের কথা শুনে ভাবলাম সিডিউল ডিউটি সবসময় নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা ঠিক না। আইনের পরিধি প্রথাগত নিয়মের বাইরে আপদকালীন একটু বাড়লে সমস্যা কি? আইনের সৃষ্টিতো মানুষের জন্যই।
সত্যটা বোঝাতে অনেক সময় লাগবে ভেবে একটু সত্য গোপন করে থানায় ওয়াকিটকিতে বললাম, আসামি ধরার জন্য জরুরী উত্তরা এলাকায় যেতে হবে। পাশের মোবাইল পার্টি যেন আমার এলাকাটার দিকে দৃষ্টি রাখে। ভদ্রলোকের স্ত্রী-ছেলেসহ ভেজা তিনজনকে ডেকে পিকআপে উঠিয়ে এক টান দিয়ে চলে গেলাম এয়ারপোর্ট। ঘড়িতে দেখলাম তখনো ৫ মিনিট বাকি আছে। পড়ি কি মরি করে নেমেই ওরা ঢুকে পড়লো এয়ারপোর্টে। ওদের নামিয়ে দ্রুত ফেরত আসলাম নিজের এলাকায়।
দুদিন পরে ভদ্রলোককে দেখলাম খিলগাঁও তালতলা মার্কেটে। বললো তার ছেলে সেদিন ঠিকমত পৌঁছেছে। জানলাম উনি তালতলা মার্কেটের নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বে আছেন। ৩ মাস পর একদিন জায়নামাজ খেজুরসহ হাজির। মনে হলো ওগুলো না নিলে তার জীবনের অপূর্ণতা থেকে যাবে, তাই বিমুখ করিনি। ওগুলো নেয়ার পরে লক্ষ্য করলাম ভদ্রলোকের চোখে মুখে তৃপ্তির ছাপ। ঘটনাটা ১৭ বছর আগের। তবে এত আগের ঘটনা হলেও মাঝে মাঝে যেদিনই ভদ্রলোককে দেখি তখনই কিছু কিছু তৃপ্তি পাওয়ার তাড়না খুব অনুভব করি। কারণ আমিও যে মানুষের অনেক সেবা নিয়েছি। কিন্তু এখনো যে অনেককে তৃপ্ত করতে পারিনি! লেখকঃ কাজী ওয়াজেদ আলী,পুলিশ পরিদর্শক ডিএমপি,ঢাকা’র ফেইসবুক ওয়াল থেকে নেয়া.