কাজী ওয়াজেদ আলী:
সনটা ২০১১, ঢাকায় বিশ্বকাপ ক্রিকেট হবে। বর্ণিল সাজে সেজেছে হোম অফ ক্রিকেট মিরপুর স্টেডিয়াম। মেগা ইভেন্ট, বিভিন্ন দেশের দর্শক, খেলোয়াড়, সংগঠকরা আসবে বাংলাদেশে। চারিদিকে সাজসাজ রব। টুর্নামেন্টের নিরাপত্তা আর সফলভাবে সমাপ্তির জন্য বিভিন্ন এজেন্সি একযোগে কাজ করছে। বাইরের জেলা থেকেও অনেক পুলিশ সদস্য এসেছে সাদা পোশাকে ডিউটি করতে। সৌভাগ্যক্রমে তখন ওসি মিরপুর হিসেবে আমার দায়িত্বও অনেক। প্রচুর ব্যস্ততা, এদিকে টিকেটের জন্য পরিচিতজনদের হাহাকার। প্রতিদিন ৫ শতাধিক ফোন কল রিসিভ। এমন নানানা ব্যস্ততার মাঝে একদিন মিরপুর থানার অফিসে বসে কাজ করছি। এমন সময় এক ব্যক্তি সাদা পোশাকে অফিসে ঢুকে সালাম দিয়ে নিজেকে বাইরের জেলা থেকে আসা সাব-ইন্সপেক্টর পরিচয় দিয়ে বললেন, স্যার, ডিউটির উমুক স্থানটা কোথায় ? আমি ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়েই চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে পড়লাম। উনি তো আমার স্কুল জীবনের শিক্ষক! উঠে পড়ে স্যারকে জড়িয়ে ধরে সালাম দিয়ে বললাম, স্যার আমি আপনার ছাত্র। স্যার আমাকে ঠিক চিনতে পারলেন না এবং অনেকটাই বিব্রত হলেন। জোর করে বসিয়ে স্যারকে নাস্তা দিতে বললাম। স্যারের বারবার বলার পরও আমি আর স্যারের সামনে বসিনি। স্যার রাজশাহী পুলিশ লাইন স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। এই স্কুলটি প্রাইমারি স্কুল থেকে যখন হাইস্কুলে রূপান্তর হয় তখন হঠাৎ শিক্ষক স্বল্পতার কারণে পুলিশে চাকরিরত মেধাবী এবং উচ্চ শিক্ষিত সদস্যদের স্কুলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। সেই হিসেবে স্যার আমার শিক্ষক ছিলেন। পরবর্তীতে শহীদ মামুন মাহমুদ উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত ওই স্কুলে অবশ্য অন্যভাবে শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়া হয়।
স্যারের নাস্তা খাওয়া দেখতে দেখতে হঠাৎ ভয়ে ভয়ে স্কুল জীবনের একটা স্মৃতির কথা মনে পড়ল। তখন রাজশাহী শহরের রাস্তার মোড়ে মোড়ে “গাদ্দার” নামে একটি সিনেমার পোস্টার দেখে খুব ইচ্ছে হলো সিনেমাটি দেখব। কিন্তু টাকা কোথায়? হঠাৎ স্কুলের বার্ষিক বিচিত্রা অনুষ্ঠানে সিনিয়র স্টুডেন্ট হিসেবে আমাদের দায়িত্ব পড়ল সেটা তদারকি করার। সে রাতে প্রধান শিক্ষক স্যারের কক্ষসহ স্কুলের অফিস কক্ষে আমাদের অবাধ বিচরণ। অনেকটা শিয়ালের কাছে মুরগি পোষ দেয়ার মতই। এবার সুযোগটা কাজে লাগালাম। অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে আমাদের মধ্যে কয়েকজন মিলে স্কুলের অফিস কক্ষ হতে পুরাতন পরীক্ষার খাতা চুরি করল। সেই চুরির খাতা পরের দিন সের দরে বিক্রি করা হলো। আর বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে পরেরদিন টিফিনে স্কুল পালিয়ে আমরা কয়েকজন মিলে সম্ভবত বর্ণালী সিনেমা হলে “গাদ্দার” সিনেমাটি দেখলাম। কিন্তু এই গাদ্দার যে শেষমেশ আমাদের কপালের সাথে গাদ্দারি করবে তো তখনো টের পাইনি।
পরদিন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানি না এমন সুবোধ বালকের মত স্কুলে ক্লাস শুরু করলাম। ইতোমধ্যে ঘটনাটি পুরো স্কুলে চাউর হলো। কিছুক্ষণ পর তিনজন শিক্ষক ক্লাসে ঢুকলেন। একে একে খাতা চোরদের নাম ডাকলেন। প্রশিক্ষিত গোয়েন্দাগিরি ছাড়াই সবগুলো চোর শনাক্ত হলো। এরপর শুরু হল শপাং শপাং বেতের বাড়ি! বাসায় গিয়ে গোপনে দেখলাম ডানপাশের রানের পিছনের অংশে গোলাপি, লাল এবং বেগুনি বর্ণের তেরঙাকৃতি ধারণ করেছে! সেই সাথে প্রচন্ড ব্যাথা, হালকা জ্বরও। কিন্তু আরও বেশি ভয় পেলাম যদি ঘটনাটা বাসায় জেনে যায়! তাহলে বোনাস হিসাবে রানের বিপরীত পাশটা মারের চোটে হয়তো এবার সাতরঙা আকার ধারণ করবে। সেই ভয়ে বাসায় বাবা-মা যাতে টের না পায় সেজন্য হাসি হাসি ভাব নিয়ে আল্লাহর নাম জপতে থাকলাম।
আমি ঠিক অনুমান করতে পারছিলাম না যে, এই স্যার সেই ঘটনাটা জানেন কিনা। ভাবলাম স্যার যদি সেই কথাটি মনে মনে স্মরণ করতে পারেন তাহলে আমার লজ্জার শেষ নেই। স্কুল জীবনের আমার সেই অপকর্মের জন্য মনে মনে খুব অনুতপ্ত ও লজ্জিত হলাম। স্যারের নাস্তা খাওয়া প্রায় শেষ হলো। স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে খুব মায়া লাগলো। ভাবলাম, এই মহান মানুষগুলোর কাছে যদি আরো ২/১ বার মার খেতে পারতাম তাহলে হয়তো আমার ভবিষ্যৎটা আরো ভালো হতো। লেখকঃ কাজী ওয়াজেদ আলী,পুলিশ পরিদর্শক,ডিএমপি,ঢাকা’র ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া.